বর্ষা এলেই বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি আর শুধু মৌসুমি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরও আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, অনুকূল আবহাওয়া এবং মশা নিয়ন্ত্রণে ঘাটতির কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
ডেঙ্গুকে কেবল একটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার এবং নাগরিক সচেতনতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বছরের পর বছর একই চিত্র দেখা যায় বর্ষা শুরু হলে মশকনিধন অভিযান জোরদার হয়, প্রচারণা বাড়ে, হাসপাতালগুলো প্রস্তুতির কথা জানায়। কিন্তু মৌসুম শেষ হলে সেই তৎপরতা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ফলে পরের বছর আবারও একই সংকট ফিরে আসে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত এর বিস্তার ঘটেছে। ফলে চিকিৎসাসেবার চাপও ছড়িয়ে পড়ছে। জেলা হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত না করা গেলে রোগীর দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। এ দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার নয়; প্রতিটি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থারও। বাসাবাড়ির ছাদ, ফুলের টব, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা জমে থাকা পরিষ্কার পানিই এডিস মশার নিরাপদ আশ্রয়। তাই পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। নিয়মিত মশার ঘনত্ব জরিপ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কার্যকর লার্ভা ধ্বংস কর্মসূচি এবং একটি জাতীয় পর্যায়ের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষজ্ঞরাও এ ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল প্রশাসন এবং সচেতন নাগরিক উদ্যোগ থাকলে এ সংকট অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। মৌসুমি প্রতিক্রিয়া নয়, সারা বছরব্যাপী সমন্বিত প্রস্তুতিই হতে পারে ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশের ভিত্তি। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।

0 Comments