কিশোর গ্যাং: হারিয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব

natunkhabar

বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং এখন একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। রাজধানী থেকে জেলা শহর, এমনকি মফস্বল এলাকাতেও কিশোরদের সংঘবদ্ধ সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। মারামারি, ছিনতাই, মাদক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার সব মিলিয়ে কিশোর গ্যাং সমাজে ভয় ও অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি করছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোরেরা, যারা একসময় দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দেওয়ার কথা। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ। নেতৃত্বশূণ্য হচ্ছে জাতি।


এ বিষয়ে স্পষ্ট কিশোর গ্যাং কোনোভাবেই ‘দুষ্টুমি’ বা ‘কিশোরসুলভ আচরণ’ বলে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সরাসরি অপরাধ ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাই আমরা মনে করি, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। একই সঙ্গে বিপথগামী কিশোরদের মানবিক পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে।

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের পেছনে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সব পক্ষের ব্যর্থতা রয়েছে। কর্মব্যস্ত জীবনে অনেক পরিবার সন্তানদের সময় দিতে পারছে না। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের অনলাইন কনটেন্ট দেখছে এসব বিষয়ে সচেতন নজরদারি কমে গেছে। ফলে কিশোরেরা সহজেই ভুল বন্ধুত্ব ও সহিংস সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

শুধু পরিবার নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। বর্তমানে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষার ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হলেও নৈতিক শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় না। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন কিশোরেরা ভার্চ্যুয়াল জগতে একধরনের বিকৃত ‘হিরোইজমে’ আকৃষ্ট হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাং সংস্কৃতিকে অনেক সময় গৌরবের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

আমরা মনে করি, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে, বিশেষ করে যারা অস্ত্র, মাদক ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে কিশোরদের জন্য কাউন্সেলিং, মনোসামাজিক সহায়তা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

সরকারের উচিত জাতীয় পর্যায়ে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংস ও অপরাধপ্রবণ কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

কিশোর গ্যাং দমন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার লড়াই। আমরা স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করি, অপরাধের প্রতি শূন্য সহনশীলতা থাকতে হবে। তবে প্রতিটি কিশোরকে সংশোধন ও নতুনভাবে গড়ে ওঠার সুযোগও দিতে হবে। কারণ আজকের বিপথগামী কিশোরকে যদি সমাজ ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আগামী দিনের সংকট আরও গভীর হবে।

Post a Comment

0 Comments